শিক্ষা ব্যবস্থাপনা

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা সংক্রান্ত নীতিমালা, ২০২৬ এর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্প্রতি ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা সংক্রান্ত নীতিমালা, ২০২৬’ জারি করেছে । এই নীতিমালায় স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়-ব্যয় এবং তহবিল ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে।

ই-ক্যাশ ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা, আয়-ব্যয় উপকমিটি, ব্যয় ব্যবস্থাপনা উপকমিটি সহ প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনা, শিক্ষার্থীদের নিকট ফি আদায়ের পদ্ধতি ডিজিটালাইজেশনসহ আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কঠোর নির্দেশনা এই নীতিমালায় অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা সংক্রান্ত নীতিমালা, ২০২৬ এর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি

শিক্ষামন্ত্রণালয়ের ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খ্রি: তারিখে ৩৭.০০.০০০০.০৭২.৪৪.০৫.২২-১৮ নং স্মারকে প্রকাশিত এই নীতিমালার মূল বিষয়গুলো সহজভাবে নিচে তুলে ধরা হলো:

১. নগদ লেনদেন বন্ধ ও অনলাইন পেমেন্ট বাধ্যতামূলক

এই নীতিমালার অন্যতম প্রধান দিক হলো সনাতন পদ্ধতির নগদ লেনদেন বন্ধ করা।

অনলাইন ফি আদায়: শিক্ষার্থীদের বেতন, ভর্তি ফি এবং সেশন চার্জসহ যাবতীয় ফি আদায়ের ক্ষেত্রে সোনালী পেমেন্ট গেটওয়ে (SPG) বা সরকারি মালিকানাধীন অন্য ব্যাংকের পেমেন্ট গেটওয়ে ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পেমেন্ট গেটওয়ে চালু হওয়ার পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নগদ অর্থ গ্রহণ করা যাবে না।

ব্যাংক হিসাব: প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় আয় সরকারি মালিকানাধীন তফশিলি ব্যাংকে জমা রাখতে হবে। জরুরি প্রয়োজনে (যেমন: প্রাকৃতিক দুর্যোগ) নগদ অর্থ গ্রহণ করা গেলেও তা পরবর্তী ০২ কর্মদিবসের মধ্যে ব্যাংকে জমা দিতে হবে।

আরও পড়ুনঃ সমন্বিত উপবৃত্তি তথ্য ফরম: শিক্ষার্থীদের তথ্য এন্ট্রি ফরম PDF ডাউনলোড

২. পুনঃভর্তি ফি বাতিল ও নির্ধারিত হার

পুনঃভর্তি ফি: কোনো প্রতিষ্ঠানে একবার ভর্তির পর একই শিক্ষার্থীর কাছ থেকে পুনঃভর্তি ফি (Re-admission fee) নেওয়া যাবে না।

ফি নির্ধারণ: সরকার নির্ধারিত হারের বাইরে অতিরিক্ত কোনো ফি আদায় করা যাবে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া আয়ের কোনো নতুন খাত সৃষ্টি করা যাবে না।

৩. ব্যয় ব্যবস্থাপনা ও ইমপ্রেস্ট ফান্ড (নগদ খরচ)

প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দৈনন্দিন খরচের জন্য ‘ইমপ্রেস্ট ফান্ড’ বা খুচরা নগদ তহবিলের বিধান রাখা হয়েছে। তবে এর সুনির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে:

নগদ খরচের সীমা (মাসিক)

প্রতিষ্ঠানের স্তর ও শিক্ষার্থীর সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠান প্রধানরা প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা নগদে খরচ করতে পারবেন।

উদাহরণস্বরূপ:

  • মাধ্যমিক পর্যায়: শিক্ষার্থীর সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে ১০,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকা ।
  • কলেজ পর্যায় (উচ্চ মাধ্যমিক ও ডিগ্রি): ১৫,০০০ থেকে ৩০,০০০ টাকা পর্যন্ত ।

চেকের ব্যবহার: নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত খরচ এবং ২৫,০০০ টাকার বেশি একক ভাউচারের ক্ষেত্রে অবশ্যই ক্রস চেকের মাধ্যমে পেমেন্ট করতে হবে।

যৌথ স্বাক্ষর: প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও প্রতিষ্ঠান প্রধানের যৌথ স্বাক্ষরে পরিচালিত হবে।

আরও পড়ুনঃ ষষ্ঠ, অষ্টম ও নবম শ্রেণির বোর্ড রেজিস্ট্রেশন: ভুল-ভ্রান্তি এড়াতে প্রতিষ্ঠান প্রধানের করণীয়

৪. বাধ্যতামূলক উপকমিটি গঠন

স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একক ক্ষমতার বদলে বিভিন্ন উপকমিটির মাধ্যমে কাজ সম্পাদন করতে হবে। প্রধানত ৬টি উপকমিটি গঠন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে:

১. অর্থ উপকমিটি: বাজেট প্রণয়ন ও আয়-ব্যয় নিরীক্ষার জন্য।

২. ক্রয় উপকমিটি: সরকারি নিয়ম (PPR-2025) মেনে মালামাল ক্রয়ের জন্য।

৩. উন্নয়ন উপকমিটি: প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও উন্নয়ন কাজের জন্য।

৪. টিউশন ফি ও সেশন চার্জ আদায় উপকমিটি: সকল প্রকার ফি আদায়ের তত্ত্বাবধানের জন্য।

৫. অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা কার্যক্রম মূল্যায়ন উপকমিটি: পরীক্ষার বাজেট ও ব্যয়ের হিসাবের জন্য।

৬. অভ্যন্তরীণ অডিট উপকমিটি: বাৎসরিক অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার জন্য।

*বিশেষ দ্রষ্টব্য: কোনো উপকমিটির সভার জন্য সদস্যদের কোনো সম্মানী বা ভাতা প্রদান করা যাবে না ।

৫. জবাবদিহিতা ও শাস্তি

দায়বদ্ধতা: যেকোনো আর্থিক অনিয়ম বা দুর্নীতির জন্য প্রতিষ্ঠান প্রধান এবং পরিচালনা কমিটির সভাপতি যৌথভাবে দায়ী থাকবেন।

শাস্তি: নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটালে বা অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের এমপিও স্থগিত, বরখাস্ত বা পরিচালনা কমিটি বাতিলসহ কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

৬. হিসাবরক্ষণ ও অডিট

ই-ক্যাশ বুক: ভাউচারসমূহ দ্রুত অনলাইনে ই-ক্যাশ বুক সিস্টেমে এন্ট্রি দিতে হবে।

অডিট: প্রতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে আগের মাসের ব্যাংক রিকনসিলিয়েশন (Bank Reconciliation) প্রস্তুত করে পরিচালনা কমিটির সভায় উপস্থাপন করতে হবে। এছাড়া প্রতি বছর ৩১ জানুয়ারির মধ্যে অভ্যন্তরীণ অডিট সম্পন্ন করতে হবে।

সারসংক্ষেপ: এই নীতিমালা বাস্তবায়নের ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে একক আধিপত্য কমবে এবং ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে আর্থিক স্বচ্ছতা ফিরে আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে। বিশেষ করে পুনঃভর্তি ফি বাতিল এবং নগদ লেনদেন বন্ধের সিদ্ধান্ত অভিভাবকদের জন্য স্বস্তিদায়ক হতে পারে।

শিক্ষা ও প্রসাশনিক বিভিন্ন বিষয়ের তথ্য সবার আগে পাওয়ার জন্য ‘বাংলা নোটিশ’ ফেসবুক পেইজটি লাইক ও ফলো করে রাখুন, ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন।

সূত্র: মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close

অ্যাডস্ ব্লকার পাওয়া গেছে!

দয়া করে আমাদের সাপোর্ট করার জন্য আপনার এডস্ ব্লকার ডিজেবল করে পেইজটি রিলোড করুন! ধন্যবাদ