জাতীয় বাজেট ২০২১–২২: মধ্যবিত্তদের জন্য হাতাশার বাজেট

জাতীয় বাজেট ২০২১–২২: মধ্যবিত্তদের জন্য হাতাশার বাজেট: এক বছর আগে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বাজেট বক্তৃতা শেষ করছিলেন স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। তাঁর আশা ছিল, করোনা মহামারি থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে এবং উন্মোচিত হবে এক আলোকিত ভোরের। কিন্তু মহামারি থেকে পরিত্রাণ মেলেনি, দেখা দেয়নি আলোকিত ভোর। অর্থনীতি এখনো সংকটে, কাটেনি অনিশ্চয়তা। আয় কমে গেছে মানুষের, নতুন করে দরিদ্র হয়েছে বিপুলসংখ্যক মানুষ। কিন্তু এই বাস্তবতার প্রতিফলন পাওয়া গেল না বাজেটে।

২০২১-২২ অর্থবছরের নতুন বাজেট প্রস্তাবে খুশি হবেন ব্যবসায়ীরা। করপোরেট করহার কমানো হয়েছে, সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে স্থানীয় শিল্পকে। কমেছে ব্যবসায়িক টার্নওভার করহার। নানাভাবেই ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু বাজেটে নেই সাধারণ মানুষের জন্য কোনো ছাড়। যাঁদের আয় কমেছে, তাঁদের জন্য তেমন কিছু নেই। এমনকি নতুন করে যাঁরা দরিদ্র হয়েছেন, তাঁদের কথাও নেই বাজেটে। সাধারণ মানুষের কাছে অর্থ দেওয়ার নেই কোনো বন্দোবস্ত। অর্থমন্ত্রীর বাজেট প্রস্তাবে হতাশ হবেন সব ধরনের মধ্যবিত্ত।

রবীন্দ্রনাথ যেমনটি লিখেছিলেন, ‘অল্প কিছু আলো থাক,/ অল্প কিছু ছায়া/ আর কিছু মায়া।’ পরিস্থিতি ঠিক এ রকমই—আলো খুবই অল্প, কিন্তু ছায়া ও মায়া—দুটোরই যেন অভাব। যা কিছু সুবিধা, সবই বড় ব্যবসায়ীদের, ছোট ও কষ্টে থাকা মানুষেরা ছায়া বা মায়া—কিছুই পেল না এই বাজেট থেকে।

এক বছর আগে অর্থমন্ত্রী যখন তাঁর দ্বিতীয় বাজেট উপস্থাপন করেন, তখন কিন্তু করোনার প্রথম ধাক্কা সামাল দেওয়ার আলোচনাই ছিল সর্বত্র। প্রথম ধাক্কা থেকে অর্থনীতি এখনো পরিত্রাণ পায়নি। উঠে দাঁড়াবার সময়েই এল দ্বিতীয় ধাক্কা। সেই ধাক্কা সামাল দেওয়ার দুশ্চিন্তা তো আছেই, আরও আছে তৃতীয় ধাক্কার শঙ্কা, টিকা সংগ্রহ নিয়েও আছে অনিশ্চয়তা। সারা বিশ্বই একমত, শিগগিরই যাচ্ছে না করোনা মহামারি। একমাত্র টিকার সঠিক ও ব্যাপক প্রয়োগের মাধ্যমেই কয়েকটি দেশ সংকট কিছুটা কাটিয়ে উঠতে পারছে। এ কারণেই হয়তো অর্থমন্ত্রী বাজেটে ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যের কথা বলেছেন। কিন্তু তাঁর দেওয়া লক্ষ্য অনুযায়ী, মাসে যদি ২৫ লাখ করে টিকা দেওয়া হয়, তাহলে ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকা দিতে লেগে যাবে প্রায় এক দশক। সুতরাং বাস্তবতা ও আকাঙ্ক্ষার মধ্যে ফারাক বিশাল।

জীবন ও জীবিকায় কতটা প্রাধান্য
অর্থমন্ত্রী নতুন অর্থবছরের বাজেটের শিরোনাম দিয়েছেন, ‘জীবন-জীবিকার প্রাধান্য দিয়ে সুদৃঢ় আগামীর পথে বাংলাদেশ’। অর্থাৎ জীবন বাঁচাতে হবে, রক্ষা করতে হবে জীবিকাকেও। মাসে ২৫ লাখ টিকা দেওয়ার নিশ্চয়তা যেমন নেই, তেমনি জীবিকা বাঁচানোর সরাসরি পরিকল্পনার কথাও বাজেটে নেই। নানা ধরনের কর ছাড় পেয়ে ব্যবসায়ীরা উদ্যোগ বাড়াবেন, বাড়বে বিনিয়োগ, উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, এতে বাড়বে কর্মসংস্থান—আদ্যিকালের সেই উপচে পড়া নীতির ওপরই সম্ভবত অর্থমন্ত্রী ভরসা রেখেছেন।

পাশাপাশি বড় আকারের বাজেট আর বড় অঙ্কের প্রবৃদ্ধির আলোচনায়ই আটকে থাকলেন অর্থমন্ত্রী। ৬ লাখ কোটি টাকার বিশাল বাজেট আর ৭ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) প্রবৃদ্ধির বড় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের উচ্চাভিলাষ বজায় রেখেছেন তিনি। অথচ এবার সব পক্ষই অর্থমন্ত্রীকে উদার হস্তে ছাড় দিতে চেয়েছিল। অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বাজেটের আগে আলোচনা করেছিলেন অর্থমন্ত্রী। সে সময় সবাই বলেছেন, এবার আর জিডিপি বা বাজেট ঘাটতির আলোচনার প্রয়োজন নেই; বরং সরকারকে ব্যয় করতে হবে।

চাহিদা বাড়াতে সাধারণ মানুষের হাতে অর্থ দিতে হবে। সুতরাং ঘাটতি বাড়লেও সমস্যা নেই। কিন্তু সে পথে হাঁটলেন না অর্থমন্ত্রী। অথচ সাধারণ মানুষের কাছে অর্থ না থাকলে বাড়বে না চাহিদা। চাহিদার অভাবে শ্লথ হয়ে থাকবে অর্থনীতি। হয়তো সাধারণ মানুষের হাতে টাকা দেওয়ার সঠিক পথটাই জানা নেই।

করহারে ছাড় ও অগ্রাধিকার
দক্ষিণ এশিয়ায়, এমনকি প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের করপোরেট করহার সবচেয়ে বেশি। ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে এই হার কমানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। অর্থমন্ত্রী পরপর দুই অর্থবছর করপোরেট হার কমালেন। এবার কমানো হলো আড়াই শতাংশ। এর ফলে দুই বছরে করপোরেট কর কমেছে ৫ শতাংশ। এতে ব্যবসায়ীরা বেশ খানিকটা ছাড় পাবেন। অর্থমন্ত্রী এবার স্থানীয় শিল্পকেও বড় হারে ভ্যাট ছাড় দিয়েছেন। গৃহস্থালি নানা ধরনের পণ্যের আমদানিনির্ভরতা কমাতে ভ্যাট ছাড়াও আগাম কর থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। নতুন নতুন কর–সুবিধা দেওয়া হয়েছে দেশে উৎপাদিত মোবাইল ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে।

অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে তিনি এবার গতানুগতিক ব্যবস্থা থেকে সরে এসেছেন। স্বাস্থ্য খাতকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন। দ্বিতীয় অগ্রাধিকার প্রণোদনা তহবিল বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখা। তৃতীয় খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অর্থমন্ত্রীর কৃষি খাত। এরপরেই আছে শিক্ষা খাত, দক্ষতা বৃদ্ধিসহ মানবসম্পদ উন্নয়ন। পল্লী উন্নয়ন ও কর্মসৃজন পঞ্চম অগ্রাধিকার খাত। সবশেষে আছে সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ। অগ্রাধিকার বদল হলেও বরাদ্দের ধরন সেই গতানুগতিকই।

প্রয়োজন বড় সংস্কার

এবারের বাজেট বাংলাদেশের ৫০তম। এবারই বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করেছে। এ জন্য বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে বাংলাদেশকে। অর্থমন্ত্রী এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনাও করেছেন। তবে যা নেই, তা হচ্ছে সামনের দিনের সংস্কার নিয়ে আলোচনা। দেশের আয় করার সামর্থ্য যেমন কম, তেমনি ব্যয় করার ক্ষমতাও। বিশেষ করে গুণমান বজায় রেখে ব্যয় করার অক্ষমতা অনেক বেশি প্রকট। এই সমস্যার সমাধান না হলে বাজেট বাস্তবায়নের সমস্যা কাটবে না বলেই অর্থনীতিবিদেরা বলে আসছেন।

বাজেটের আগে ব্যবসায়ীদের বড় অভিযোগ ছিল সামগ্রিক করব্যবস্থা নিয়েই। একাধিক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছিলেন, দেশের করব্যবস্থা ব্যবসা–বৈরী। এ থেকে উত্তরণে দরকার ছিল বড় ধরনের সংস্কারের। প্রণোদনা তহবিল দেওয়া হচ্ছে ব্যাংকের মাধ্যমে। ব্যাংক খাতের সংস্কারের কথা এই অর্থমন্ত্রীই বলেছিলেন ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে। আবার কর-জিডিপি নিম্নতম বলে সরকার নিজের অর্থে বড় আকারের প্রণোদনা তহবিলও দিতে পারেনি। সুতরাং করব্যবস্থার বড় সংস্কার প্রয়োজন।

বিস্তারিত পড়ুন

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো

আপনার জন্য আরও কিছু তথ্য:

আনসার আহাম্মদ ভূঁইয়া

আমি একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক, শিক্ষা-তথ্য গবেষক এবং শিক্ষা বিষয়ক কনটেন্ট নির্মাতা, যিনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের স্কুল-কলেজ শিক্ষা প্রশাসন, শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া, এমপিও কার্যক্রম, উপবৃত্তি, একাডেমিক নোটিশ এবং শিক্ষানীতির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করে আসছি। বাস্তব অভিজ্ঞতা, তথ্য যাচাই এবং সরকারি নির্দেশনার আলোকে নির্ভুল ও আপডেটেড তথ্য প্রদান করাই আমার প্রধান লক্ষ্য। এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে আমি শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্ভরযোগ্য, অথেনটিক এবং সহজবোধ্য শিক্ষা-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করি। প্রতিটি কনটেন্ট প্রকাশের আগে তথ্যের উৎস যাচাই, নির্দেশিকা বিশ্লেষণ এবং ব্যবহারকারীর প্রয়োজন বিবেচনা করা হয়, যাতে পাঠকরা সঠিক ও কার্যকর নির্দেশনা পান। শিক্ষা ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ঘাটতি দূর করা, জটিল প্রক্রিয়াকে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা এবং দ্রুত আপডেট পৌঁছে দেওয়া— এই তিনটি বিষয়কে আমি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করি। আমার বিশ্বাস, বিশ্বস্ত তথ্য, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং স্বচ্ছ উপস্থাপনই একটি শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্মের মূল ভিত্তি। সেই লক্ষ্যেই আমি নিরন্তরভাবে কাজ করে যাচ্ছি, যাতে শিক্ষাসংক্রান্ত সঠিক তথ্য সবার কাছে সহজে পৌঁছে যায়।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close

অ্যাডস্ ব্লকার পাওয়া গেছে!

দয়া করে আমাদের সাপোর্ট করার জন্য আপনার এডস্ ব্লকার ডিজেবল করে পেইজটি রিলোড করুন! ধন্যবাদ