‘ব্যাংক দেউলিয়া হলে গ্রাহক পাবে এক লক্ষ টাকা’ সঠিক তথ্য জানুন

সম্প্রতি অনলাইন দুনিয়ায় একটি নিউজ ভাইরাল হয়েছে। ব্যাংক দেউলিয়া হলে গ্রাহকের একাউন্টে যত টাকায় থাকুক গ্রাহক এক লক্ষ টাকার বেশি পাবে না। এই শিরোনামে বিভিন্ন নিউজ ছড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে।

কিন্তু প্রকৃত ঘটনা অনেকেই জানেনা আবার অনেকে জানলেও নিজেকে ভাইরাল করতে ভিন্ন ভাবে তথ্য উপস্থাপন করে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করছে।

এতে করে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাংকের প্রতি অনাস্থা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অনেকেই তার কষ্টার্জিত অর্থ ব্যাংক থেকে তুলে অন্য কোথাও রাখার চিন্তাভাবনা করছে।

বিভ্রান্তিমূলক ও ভুয়া খবরে দেশের মানুষের ব্যাংকের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হচ্ছে। এতে করে দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।

এই পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় রেখে আপনাদেরকে এই খবরটি নিয়ে সঠিক তথ্য দেওয়ার জন্য গত কয়েক দিন ধরে বাংলা নোটিশ ডট কম এর প্রতিনিধি বিভিন্ন ব্যাংক ব্যক্তিত্বের সাথে আলোচনা করেছে।

বিভিন্ন পত্র পত্রিকা এবং ব্যাংক ব্যক্তিত্বের সাথে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করার পর বিভিন্ন বিষয় তুলে আনার চেষ্টা করেছে-

ব্যাংক দেউলিয়া ও আমানত ফিরে পাওয়া নিয়ে জনাব আলী হোসেন স্বপন স্যারের গবেষণাধর্মী মন্তব্যটি আপনাদের সুবিধার্থে হুবহু তুলে ধরা হলো-

আমানত সুরক্ষা আইন নিয়ে কিছু কথাঃ

কিছুদিন ধরে আমানতকারীগণের মধ্যে উৎন্ঠার একটা বিষয় হলো আমানত সুরক্ষা আইন (যা এখন খসড়া মাত্র)। উক্ত খসড়ার কিছু বিষয়ে অস্পষ্টতার কারনে জনমতে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। প্রথমতঃ এ আইনের নাম করনে কিছুটা সমস্যা রয়েছে। এ আইনটি মুলতঃ ব্যাংক আমানত বীমা আইন, 2000 এর নতুন সংস্করন। প্রত্যেক ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান আমানতের বিপরীতে বীমা করতে হয় এবং উক্ত বীমার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রিমিয়াম জমা দিতে হয়। এ প্রিমিয়াম জমা বাধ্যতামূলক। নতুন ”আমানত সুরক্ষা আইন, 2017” এর অধিনে কোন ব্যাংক কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়িত হলে উক্ত বীমার অধিনে একজন গ্রাহক তার বীমাকৃত টাকার পরিমান (1 লক্ষ টাকার কম হলে) অথবা সর্বোচ্ছ 1 লক্ষ টাকার ক্ষতিপূরন পাবেন। যদি একজন গ্রাহকের হিসাবে 40,000 টাকা থাকে তাহলে উনি বীমার অধিনে 40,000 টাকা প্রাপ্ত হবেন। আর যদি তার হিসাবে 1,20,000 টাকা থাকে তাহলে উনি বীমার অধিনে সর্বোচ্ছ 1,00,000 লক্ষ পাবেন। তবে উক্ত টাকা তার মূল টাকার অতিরিক্ত। অর্থ্যাৎ গ্রাহকের হিসেবে থাকা টাকা + বীমার জন্য প্রাপ্ত হবেন। এ ক্ষেত্রে 40,000 হিসেবে থাকা গ্রাহক মোট পাবেন 40,000+ বীমার জন্য আরো 40,000, সর্বমোট 80,000 টাকা। আবার 1,20,000 হিসেবে থাকা গ্রাহক পাবেন 1,20,000 টাকা + 1,00,000, সর্বমোট 2,20,000 টাকা। একজন গ্রাহকের একাধিক হিসাব থাকলেও তিনি বীমার জন্য সর্বোচ্ছ এক লক্ষ টাকা পাবেন। প্রত্যেকটা হিসাবের জন্য আলাদা আলাদা এক লক্ষ টাকা করে পাবেননা।
এবার আমরা সমস্যা তৈরী হবার কারনগুলো একটু আলোচনা করি।
প্রথমতঃ নামকরন। এ আইনের নামকরনে বীমা কথাটা না থাকায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। তবে খসড়া আইনের শুরুতে এবং 10 নং সেক্শনে বুঝা যায় এটা মূলতঃ পূর্বের আমানত বীমা আইন, 2000 এর সংশোধন, যা স্পষ্ট করা থাকলে এ সমস্যা দূর করা যেত। আমরা আশা করব পরবর্তীতে আইনটি পাশের সময় বিষয়টি স্পষ্ট করে দেয়া হবে। তবে আইনটি যেহেতু আমানত সুরক্ষা আইন সেহেতু এটা আমাদের আমানতকে সুরক্ষা করবে এটাই আমরা আশা করি। আইন প্রনেতাগণও তাই মনে করেন যে আমানতের টাকার অতিরিক্ত বীমার টাকা তাদের আমানতকে সুরক্ষা দেবে।
দ্বিতীয়তঃ এ খসড়া আইনের সেকশন 7 এর উপধারা 1 এবং 2 এর অস্পষ্টতা। সেখানে আমানতকৃত টাকার অতিরিক্ত বীমার অংশ হিসেবে বীমাকৃত টাকার পরিমান অথবা এক লক্ষ টাকা প্রাপ্তির বিষয়টি স্পষ্ট করে দিলে এ সমস্য এড়ানো যেত।
কিছু কথাঃ কোন দেশের অর্থনীতি বালিশ কিংবা লেপ ভিত্তিক নয়, আশা করি সরকার কখনোই এমন সিদ্ধান্ত নিবেনা যাতে করে মানুষ ব্যাংকে টাকা না রেখে বালিশ কিংবা লেপের মধ্যে রাখবে। তবে ব্যাংকে রেখে যদি সর্বোচ্ছ এক লক্ষ টাকাই পাওয়া যায় তাহলে বালিশ, লেপই ভাল। কারন ইদুর, পোকা খাওয়ার পরেও নিশ্চয় এক লক্ষের বেশীই পাওয়া যাবে! তবে বালিশ, লেপে তালার ব্যবস্থা করে রাখা যেতে পারে যাতে করে ইদুর কিংবা পোকা ছাড়াও অন্য আক্রমন থেকে কিছুটা রক্ষা পাওয়া যায়।

খসড়া আইনটি বাংলাদেশ ব্যাংকের website এ Proposed Act as “Deposit Protection Act, 2017 “ শিরোনামে দেয়া আছে ।
অবশেষেঃ গ্রাহক ব্যাংক কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে টাকা রাখেন লাভের জন্য। তাতে যদি টাকা হারানোরই ভয় থাকে তাহলে টাকা রাখবেন কেন?

ব্যাংক অবসায়ন এবং আমানত ফেরত পাওয়া নিয়ে কিছু কথা-

গত কিছুদিন ধরে মানুষের মনে যে বিষয়টি ঘুরপাক খাচ্ছে তা হলো ব্যাংক অবসায়ন। আমাদের ধারনা একটি ব্যাংক চাইলেই তার ব্যবসা বন্ধ করে দিয়ে গ্রাহকের টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যেতে পারে।

আমরা এ বিষয়টি একটু সংক্ষিপ্ত আকারে আলোচনা করব, তবে তা কেবলই আইনের চোখ দিয়ে। বাংলাদেশের কোম্পানীগুলো Companies Act, 1994 অনুযায়ী পরিচালিত হলেও এমন কিছু কোম্পানী রয়েছে যেগুলো মূলত তাদের প্রাইমারি রেগুলেটর কর্তৃক নির্ধারিত আইন, সার্কুলার ইত্যাদি দ্বারা পরিচালিত হয়।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরও তেমন একটি সেক্টর যা Companies Act, 1994 এর বাহিরে তার প্রাইমারি রেগুলেটর তথা বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত আইন, সার্কুলার ইত্যাদি দ্বারা পরিচালিত হয়।
এ ক্ষেত্রে The Bank Companies Act, 1991 হলো ব্যাংকগুলোর প্রধান আইন। এ আইনের বাহিরে গিয়ে কিছু করার সুযোগ ব্যাংকগুলোর নেই। উক্ত আইনের Sixth and Seventh সেক্শনে (ধারা 64 থেকে শুরু) ব্যাংক অবসায়ন নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।
উক্ত সেকশন অনুযায়ী কোন ব্যাংক চাইলেই অবসায়নে যেতে পারবেনা। তবে তারা কেবল হাইকোর্ট এ অবসায়নের আবেদন করতে পারবে। তাদের আবেদনের পর বিষয়টি চলে যাবে সম্পূর্ণ বাংলাদেশ ব্যাংক এবং হাইকোর্টের উপরে, যাতে ব্যাংকের মালিকদের আর কিছু করার থাকবেনা। সবকিছু তদারকি করবে আদালত কর্তৃক নিয়োজিত অবসায়ক।
এখানে বলে রাখা ভালো বর্তমানে একটি ব্যাংক শুরু করার জন্য সর্বনিম্ন Paid up capital হতে হবে ৪০০ কোটি টাকা (বর্তমানে নতুন ব্যাংক এর জন্য ৫০০ কোটিও করা হচ্ছে)। এ টাকাটা পুরোটাই দেয় ব্যাংকের স্পন্সর শেয়ারহোল্ডারগণ। এর বাহিরে গ্রাহকদের জমাকৃত ডিপোজিট দিয়ে ব্যাংকিং কর্মকান্ড পরিচালিত হয়।
একটি ব্যাংক গ্রাহকের কাছ থেকে প্রাপ্ত ডিপোজিটের সবটুকু investment করতে পারেনা। তাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুস্মরন করে CRR & SLR মেনটেইন করতে হয়। যার বর্তমান হার হলো conventional ব্যাংকের জন্য 18.50% এবং ইসলামিক ব্যাংকের জন্য 11%, অর্থ্যাৎ একটি conventional ব্যাংক তার প্রতি 100 টাকা ডিপোজিটের 81.50 টাকা এবং ইসলামিক ব্যাংক 89 টাকা investment করতে পারে, বাকি টাকা ব্যাংকগুলোকে সংরক্ষণ করতে হয়। আর এর মাধ্যমে গ্রাহকের আমানতকেও সুরক্ষা দেয়া হয়।
তাছাড়া BASEL, Liquidity Coverage Ratio, Risk-weighted assets, capital conservation buffer, capital adequacy ratio, CAMELS, provision ইত্যাদি শক্তিশালী টুলসের মাধ্যমে একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশের ব্যাংকগুলোকে সুরক্ষার পথ দেখিয়ে থাকে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক BASEL এ্যাকোর্ড অনুসারে ব্যাংকের ক্যাপিটালকে দেখভাল করে বলে ব্যাংকের ক্যাপিটাল অন্যান্য যেকোন প্রতিষ্ঠান থেকে অনেক বেশি এবং শক্তিশালীও হয়ে থাকে।

এবার আসি অবসায়ন হলে গ্রাহক তার টাকা কিভাবে পাবে সে বিষয়ে।

একটি ব্যাংক অবসায়িত হলেও গ্রাহক তার টাকা অবশ্যই পাবেন। তবে তিনি পুরো টাকাটা একসাথে নাও পেতে পারেন। অবসায়িত হলে অবসায়কের মাধ্যমে গ্রাহকের ক্লেইম পরিশোধ করা হয় এবং ক্লেইম পরিশোধের সময়ে সবার আগে যাদের ক্লেইম পরিশোধ করা হয় তারা হলেন ডিপোজিটর।

এ ক্লেইম পরিশোধ করার জন্যে উক্ত ব্যাংকের সকল Asset, investment ইত্যাদিকে বিবেচনায় নেয়া হয়। এ ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম ডিপোডিটরদের ক্লেইম পরিশোধ করার পর অন্যান্য ক্লেইম পরিশোধ করা হয়, আর এ ক্ষেত্রে সবার ক্লেইম পরিশোধ করার পর যদি কিছু থাকে তাহলে মালিকদের/শেয়ারহোল্ডারদের ক্লেইম পরিশোধ করা হয়। যেহেতু সকল Asset, investment ইত্যাদি থেকে টাকাটা এক সাথে আসেনা সেহেতু গ্রাহক টাকাটাও একসাথে না পেতে পারেন।

এবার একটু বাংলাদেশের অতিত ইতিহাসের দিকে একটু তাকাই আমরা।

বাংলাদেশের মানুষ ICB এবং Farmers ব্যাংকের খারাপ অবস্থা নিশ্চয় দেখেছেন কিংবা শুনেছেন। কিন্তু কেউ কি বলতে পারেন এ ব্যাংকগুলো থেকে কোন গ্রাহক তার প্রাপ্ত টাকা ফেরত পাননি? প্রত্যেকে তাদের টাকা ফেরত পেয়েছেন, তবে হয়ত একটু সময় লেগেছে। একটু পরে হলেও বাংলাদেশ সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ঠিকই ব্যাংকগুলোকে সমস্যা থেকে উঠিয়ে এনেছেন। ভবিষ্যতেও কোন ব্যাংক বিপদে পড়ার আগেই সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ঠিকই তাদেরকে সঠিক পথে নিয়ে আসবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি। তাই অযথা ব্যাংক বন্ধ হওয়া নিয়ে উৎকন্ঠিত হবার কোন মানেই হয়না।
তবে হা, একজন গ্রাহক তার টাকা রাখার আগে ভালো-মন্দ ইত্যাদি বিবেচনা করবেন এটাই প্রত্যাশিত।

পরিশষে বলি, বাংলাদেশের বর্তমান আইনুযায়ী কোন ব্যাংক চাইলেই স্বেচ্ছায় অবসায়নে যেতে পারবেনা, কিংবা ব্যাংকের মালিকরাও ইচ্ছা থাকলেও তা লুঠেপুটে খেতে পারবেনা।

তাই আমরা ডিপোজিটরাও এত বেশী উৎকন্ঠিত না হয়ে ভাল-মন্দ যাচাই করে আমাদের ডিপোজিটগুলো সঠিক স্থানে রাখব।

মহান আল্লাহ আমাদের ধন-সম্পদকে হেফাজত করুক।

এই কলামটি লিখেছেন- 

Ali Hossain Swapan
FAVP,

Board & Company Secretariat
Union Bank Ltd
Head Office

 

আরও পড়ুন:

শিক্ষা, ভর্তি, পরীক্ষা, চাকুরি, বৃত্তি, রাজনীতি, অর্থনীতি সহ দেশ-বিদেশের সকল অফিসিয়াল বিজ্ঞপ্তি ও খবর পেতে আমাদের ফেসবুক পেইট লাইক ও ফলো করে রাখুন;

আপনার প্রতিষ্ঠানের যেকোন বিজ্ঞপ্তি বিনামূল্যে প্রকাশ করতে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন;