১৭ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর যে চিঠি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাঠ করতে হবে

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঐতিহাসিক ৭ মার্চ ২০২০ উপলক্ষে একটি বাণী প্রদান করেন।

প্রধানমন্ত্রীর এই বাণীটি সকল প্রাথমিক বিদ্যালয় ১৭ মার্চ ২০২০ মুজিববর্ষে অর্থাৎ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মবার্ষিকী তে পড়ে শোনানো নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।

প্রত্যেক প্রাথমিক বিদ্যালয় ১৭ ই মার্চ অনুষ্ঠান সূচিতে এই চিঠি পাঠ করতে হবে।

আপনাদের সুবিধার্থে চিঠিটি হুবহু তুলে ধরা হলো-

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এর ঐতিহাসিক ৭ মার্চ ২০২০ উপলক্ষে বাণী-

“বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে ৭ মার্চ এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক এই দিনে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ডাক দেন। ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের বিশাল জনসমুদ্রে তিনি বজ্রকন্ঠে ঘোষণা দেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, জয় বাংলা’। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এ অঞ্চলের জনগণের উপর নেমে আসে বৈষম্য আর নির্যাতনের যাঁতাকল। অর্থনৈতিক বৈষম্য ছাড়াও সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির মাতৃভাষাকে উপেক্ষা করে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী। শুরু হয় বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। ১৯৪৮-৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৫৪’র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬’র ছয় দফা আন্দোলন, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান এবং ৭০’র এর সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ের পথ ধরে বাঙালি মুক্তির সংগ্রাম যৌক্তিক পরিনতির দিকে ধাবিত হয়। আর এসব আন্দোলন সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অবশেষে চলে আসে ৭ মার্চের ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ। রেসকোর্সের জনসভায় দাঁড়িয়ে তিনি প্রদান করেন স্বাধীনতার পথ নকশা। যুদ্ধ অনিবার্য জেনে তিনি শত্রুর মোকাবেলায় বাঙালি জাতিকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন ‘তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো’। জাতির পিতার এই সম্মোহনী আহবানে সাড়া দিয়ে বাঙালি জাতির সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা গণহত্যা শুরু করে। জাতির পিতা ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ মানুষ শহীদ হন। ২ লাখ মা-বোন সম্ভ্রমহারা হন। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ আর বহু ত্যাগের বিনিময়ে আমরা ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করি। পরাধীনতার শৃংখল থেকে ছিনিয়ে আনি মহান স্বাধীনতা, বাঙালি জাতি মুক্তি পায় মুক্তির কাঙ্খিত স্বাদ। প্রতিষ্ঠা পায় স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক ভাষণ। লেখক ও ইতিহাসবিদ Jacob F Field এর বিশ্বসেরা ভাষণ নিয়ে লেখা We Shall Fight on the beeches : The Speeches That Inspired History গ্রন্থে এই ভাষণ স্থান পেয়েছে। অসংখ্য ভাষায় অনূদিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ। জাতির পিতার ইতিহাস ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেস্কো কর্তৃক ২০১৭ সালে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহাসিক (World Documentary Heritage) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সমগ্র দেশ ও জাতি গর্বিত। এই স্বীকৃতির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বাঙালির বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম ও সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে জাতির পিতার এই ভাষণের দিক নির্দেশনাই ছিল সেসময় বজ্রকঠিন জাতীয় ঐক্যের মূলমন্ত্র। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অমিত শক্তির উৎস ছিল এই ঐতিহাসিক ভাষণ। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ আমাদের ইতিহাস এবং জাতীয় জীবনের এক অপরিহার্য ও অনস্বীকার্য অধ্যায়; যার আবেদন চির অম্লান।

কালজয়ী এই ভাষণ বিশ্বের শোষিত, বঞ্চিত ও মুক্তিকামী মানুষের সব সময় প্রেরণা জুগিয়ে যাবে। জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে ১৭ ই মার্চ ২০২০ থেকে ২৬ মার্চ ২০২১ সময়কে ‘মুজিব বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আমরা বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজগুলো বাস্তবায়ন করছি। তিনি যে সোনার বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, বাঙালি জাতির জন্য যে উন্নত জীবনের কথা ভেবেছিলেন, তার সেই স্বপ্নকে আজ আমরা বাস্তবে রূপ দিচ্ছি।

রূপকল্প ২০২১ ও ২০৪১ এবং ডেল্টা প্লান-২১০০ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত ও সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছি। গত ১১ বছরে আমরা দেশের প্রতিটি খাতে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করেছি। ইতোমধ্যে আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নত হওয়ায় যোগ্যতা অর্জন করেছে।বাংলাদেশ আজ আত্মমর্যাদাশীল দেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। আসুন, আমরা দৃঢ় সংকল্পে আবদ্ধ হই- বাংলাদেশকে আমরা বিশ্বসভায় আরও উচ্চাসনে নিয়ে যাবো; আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ শান্তিপূর্ণ আবাসভূমিতে পরিনত করব; ঐতিহাসিক ৭ মার্চে এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।”

জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু
বাংলাদেশ চিরজীবী হোক

—- শেখ হাসিনা

এই চিঠিটি প্রিন্ট উপযোগী ডাউনলোড করুন

এই সম্পর্কিত আরও পড়ুন-

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *